
আ ফ ম বোরহান
একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বায়নের যুগে মানুষ জীবন, জীবিকা ও শিক্ষার তাগিদে নিজ জন্মভূমি ছেড়ে দেশের বড় শহর কিংবা বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে। ভৌগোলিক দূরত্ব মানুষের অবস্থানের পরিবর্তন ঘটালেও শেকড়ের টান এবং সংস্কৃতির আত্মিক বন্ধনকে ছিন্ন করতে পারে না। এই বাস্তবতায় বিশ্বজুড়ে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন আঞ্চলিক ও কমিউনিটি ভিত্তিক অরাজনৈতিক জনকল্যাণমুখী সংগঠন। নিজ সংস্কৃতির ধারক, প্রবাসে পারস্পরিক সহযোগিতার নির্ভরযোগ্য আশ্রয় এবং জন্মভূমির টেকসই উন্নয়নের চালিকাশক্তি হিসেবে এই সংগঠনগুলোর প্রয়োজনীয়তা আধুনিক সমাজে অনস্বীকার্য। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই ধরনের সফল ও আদর্শ আঞ্চলিক সংগঠনের একটি অন্যতম বাস্তব উদাহরণ হলো সীতাকুণ্ড সমিতি। আশার কথা হলো আজ বিশ্ব ব্যাপী ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে প্রাণের সংগঠন সীতাকুণ্ড সমিতি।

বিশ্বব্যাপী কমিউনিটি সংগঠনের বহুমাত্রিক প্রয়োজনীয়তা:
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত একই অঞ্চলের মানুষের সমন্বয়ে গঠিত সামাজিক বা আঞ্চলিক সমিতিগুলো কেবল আনুষ্ঠানিক কোনো ক্লাব নয়, বরং তা বহুমুখী সামাজিক ও জাতীয় গুরুত্ব বহন করে।
সাংস্কৃতিক পরিচয় ও শেকড়ের সন্ধান:
প্রবাসের যান্ত্রিক জীবনে নতুন প্রজন্ম যখন নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতি থেকে বিচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে, তখন এই সংগঠনগুলো বিভিন্ন সাংস্কৃতিক উৎসব (যেমন: মেজবান, পিঠা উৎসব, বৈশাখী মেলাসহ দেশীয় নানান সংস্কৃতি) আয়োজনের মাধ্যমে নিজস্ব কৃষ্টিকে টিকিয়ে রাখে।
পারস্পরিক সংহতি ও নেটওয়ার্কিং:
অপরিচিত বা নতুন পরিবেশে একই অঞ্চলের মানুষের মিলনমেলা পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ববোধ বাড়ায়। এটি পেশাগত উন্নয়ন ও ব্যবসায়িক যোগাযোগের একটি শক্তিশালী ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করে।
সংকটকালীন দ্রুত ও মানবিক সহায়তা:
প্রবাসে কোনো সদস্যের আকস্মিক মৃত্যু, আইনি জটিলতা, দুর্ঘটনা বা চিকিৎসার প্রয়োজনে এই সংগঠনগুলো তাৎক্ষণিক ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়। করোনাকালীন দুর্যোগ কিংবা বৈশ্বিক মন্দার সময়েও কমিউনিটি সংগঠনগুলোর তহবিল গঠন ও ত্রাণ বিতরণ প্রশংসনীয় ভূমিকা রেখেছে।
জন্মভূমির অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন:
রেমিট্যান্সের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতি সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি প্রবাসীরা এই সমিতির মাধ্যমে সুনির্দিষ্টভাবে নিজ এলাকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও দারিদ্র্য বিমোচনে প্রত্যক্ষভাবে অর্থ এবং মেধা বিনিয়োগ করতে পারেন।
সীতাকুণ্ডের ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব এবং সমিতির প্রেক্ষাপট:
দক্ষিণ-পূর্ব বাংলাদেশের প্রবেশদ্বার এবং গিরি-সৈকতের অনন্য মেলবন্ধনে ঘেরা চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর অর্থনৈতিক অঞ্চল। একদিকে দেড় শতাধিক বৃহৎ ও মাঝারি শিল্প-কারখানা, আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাত শিপব্রেকিং ইয়ার্ড (জাহাজ ভাঙা শিল্প) এবং পর্যটন কেন্দ্র; বারআউলিয়ার পূণ্যভূমি অন্যদিকে হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান তীর্থস্থান চন্দ্রনাথ ধাম—সবমিলিয়ে সীতাকুণ্ডের বৈচিত্র্য অসাধারণ।
এই অতি-গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে যেমন বিপুল অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ চলে, তেমনি পরিবেশ দূষণ, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের তীব্র দুর্ঘটনা প্রবণতা, এবং স্থানীয় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতির মতো বহুমুখী চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এই বিশাল সম্ভাবনার সঠিক ব্যবহার এবং নাগরিক সংকট দূরীকরণে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি একটি শক্তিশালী সামাজিক প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজনীয়তা থেকে প্রতিষ্ঠিত হয় বিশ্ব ব্যাপী অরাজনৈতিক সংগঠন সীতাকুণ্ড সমিতি।
সীতাকুণ্ড সমিতির লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও সমাজকল্যাণমূলক কার্যক্রম:
সীতাকুণ্ড সমিতি প্রতিষ্ঠার পর থেকে কেবল চায়ের আড্ডার গণ্ডি পেরিয়ে কাঠামোগত সমাজ সংস্কার ও জনকল্যাণে ব্যাপক অবদান রেখে চলেছে। এর মূল কার্যক্রমগুলোকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়।

শিক্ষাক্ষেত্রে বৈপ্লবিক অবদান:
সমিতির অন্যতম প্রধান মূলমন্ত্র হলো শিক্ষা বিস্তার ও মেধাবীদের মূল্যায়ন। প্রতি বছর সীতাকুণ্ডের শত শত কৃতি শিক্ষার্থীদের (এসএসসি, এইচএসসি ও সমমান) জিপিএ-৫ প্রাপ্তির জন্য বর্ণাঢ্য সংবর্ধনা, প্রাইজবন্ড, এবং শিক্ষাবৃত্তি প্রদান করা হয়। পাশাপাশি সীতাকুণ্ডের প্রত্যন্ত অঞ্চলের দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের মাঝে বিনামূল্যে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ ও আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা সমিতির একটি নিয়মিত কর্মসূচি।
নাগরিক অধিকার রক্ষা ও মহাসড়কের নিরাপত্তা আন্দোলন:
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুণ্ড অংশটি দীর্ঘকাল ধরে একটি মারাত্মক দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। সীতাকুণ্ড সমিতি এই দুর্ঘটনারোধে কেবল দুঃখ প্রকাশ করেই ক্ষান্ত থাকেনি, বরং মহাসড়কে পথচারী পারাপারের ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ, গতি নিয়ন্ত্রণ এবং জেব্রা ক্রসিং, সমুদ্র উপকূলবর্তী বেড়ীবাঁধকে মহাসড়কে রূপান্তর ও সীতাকুণ্ড রেলওয়ে স্টেশনে আন্তঃনগর ট্রেনের যাত্রা বিরতির দাবিতে দেশে-বিদেশে দীর্ঘ মানববন্ধন ও সুশীল সমাজকে সাথে নিয়ে তীব্র নাগরিক আন্দোলন গড়ে তুলেছে, যা নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয়েছে।
ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রকাশনা:
আঞ্চলিক ইতিহাস রক্ষা ও সমাজকে আলোকিত করার উদ্দেশ্যে সমিতি নিয়মিত প্রকাশ করে চলেছে স্মারক ম্যাগাজিন। এই প্রকাশনাগুলোর মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম সীতাকুণ্ডের গৌরবময় অতীত, কৃষ্টি এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের অবদান সম্পর্কে জানতে পারছে।
প্রবাসে বিশ্বজনীন বিস্তার ও দ্বিপাক্ষিক ভূমিকা:
সীতাকুণ্ডের সন্তানরা কেবল বিভাগীয় শহর চট্টগ্রাম বা রাজধানী ঢাকাতেই সীমাবদ্ধ নন, তারা মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অত্যন্ত সফলতার সাথে কাজ করছেন। প্রবাসে নিজেদের ঐক্য বজায় রাখতে এবং দেশের সীতাকুণ্ডবাসীর কল্যাণে তারা শক্তিশালী শাখা গঠন করেছেন।
সীতাকুণ্ড সমিতি ইউকে (যুক্তরাজ্য): সম্প্রতি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে লন্ডনে জাঁকজমকপূর্ণ বার্ষিক সাধারণ সভা ও নির্বাচনের মাধ্যমে সেলিম হোসাইনকে সভাপতি এবং মোঃ রায়হান উদ্দিন চৌধুরী টিটুকে সাধারণ সম্পাদক করে ২০২৬-২০২৮ মেয়াদের নতুন কমিটি গঠিত হয়েছে। এই শাখাটি যুক্তরাজ্যে বসবাসরত সীতাকুণ্ডবাসীদের আইনি, সামাজিক সহযোগিতা এবং দেশের নানাবিধ দাতব্য প্রকল্পে সরাসরি অর্থায়ন করে আসছে।
আধুনিক সমাজ বিনির্মাণে এই সমিতির প্রাসঙ্গিকতা:
সীতাকুণ্ড সমিতির সামগ্রিক সাংগঠনিক কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি একটি আদর্শ এবং অনুকরণীয় “কমিউনিটি ওরিয়েন্টেড মডেল”।
এটি সরকারের ওপর চাপ না বাড়িয়ে বেসরকারি এবং স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগে কীভাবে আঞ্চলিক সমস্যার সমাধান করা যায়, তা দেখিয়েছে। এটি দলমত নির্বিশেষে সকল মতাদর্শের মানুষকে একটি অরাজনৈতিক ছায়াতলে এনে ভ্রাতৃত্বের এক নতুন সংস্কৃতি তৈরি করেছে। প্রবাসীদের অর্জিত অর্থ কেবল বিলাসবহুল জীবনে ব্যয় না করে, গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা ও যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ব্যয়ের পথ সুগম করেছে।
উপসংহার:
বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা মানুষের জন্য আঞ্চলিক সমিতিগুলো কেবল স্মৃতিকাতরতার জায়গা নয়, বরং এটি উন্নয়নের এক একটি শক্তিশালী ইঞ্জিন। সীতাকুণ্ড সমিতি দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে শিক্ষা, মানবসেবা ও আঞ্চলিক উন্নয়নে যে অবদান রেখে চলেছে, তা যেকোনো অঞ্চলের সামাজিক সংগঠনের জন্য একটি অনন্য মডেল । বিশ্বায়নের এই যুগে নিজ পরিচয় বাঁচিয়ে রেখে দেশমাতৃকার সেবায় আত্মনিয়োগ করার ক্ষেত্রে সীতাকুণ্ড সমিতি এবং এর বিশ্বব্যাপী শাখাগুলোর মতো সংগঠনের ভূমিকা দিন দিন আরও বেশি অপরিহার্য হয়ে উঠছে।








