স্টার নিউজ
লাখো ভক্তের ‘আমিন, আমিন’ ধ্বনিতে এবং বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর শান্তি, শৃঙ্খলা ও দেশ-জাতির সমৃদ্ধি কামনার মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হয়েছে মাইজভাণ্ডারী তরিকার প্রবর্তক গাউছুল আজম হযরত মওলানা শাহ সুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ (ক.)-এঁর ১২০তম বার্ষিক ওরশ শরীফ।
শনিবার (২৪ জানুয়ারি) দিবাগত রাতে গাউছিয়া আহমদিয়া মঞ্জিল শাহী ময়দানে আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করেন গাউছিয়া আহমদিয়া মঞ্জিলের সাজ্জাদানশীন হযরত মওলানা শাহসুফি সৈয়দ এমদাদুল হক মাইজভাণ্ডারী (ম.)।
মোনাজাতে তিনি মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের দরবারে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের নির্যাতিত মুসলমানদের হেফাজত, দেশের স্থায়িত্ব, শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করেন। তিনি বিশ্বজুড়ে হানাহানি বন্ধ ও মানবতার কল্যাণ প্রার্থনা করেন।
ওরশ শরীফ উপলক্ষে সাজ্জাদানশীন হযরত মওলানা শাহসুফি সৈয়দ এমদাদুল হক মাইজভাণ্ডারীর আয়োজন ও ব্যবস্থাপনায় এবং নায়েব সাজ্জাদানশীন সৈয়দ ইরফানুল হক মাইজভাণ্ডারীর সার্বিক তত্ত্বাবধানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখো আশেক-ভক্ত মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফে সমবেত হন। বাংলাদেশ ছাড়াও সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, মালয়েশিয়া ও ওমানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে অসংখ্য ভক্ত-অনুরক্ত এই আধ্যাত্মিক মিলনমেলায় অংশ নেন।
মোনাজাতের আগে সমবেত ভক্তদের উদ্দেশ্যে সৈয়দ এমদাদুল হক মাইজভাণ্ডারী বলেন, বর্তমান অস্থির পৃথিবীতে শান্তির জন্য মাইজভাণ্ডারী ত্বরিকা এক অনন্য আলোকবর্তিকা। গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারী ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের তরে যে প্রেম ও ভালোবাসার বাণী প্রচার করেছেন, তা ধারণ করলেই সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব। আমাদের আত্মশুদ্ধি অর্জন করতে হবে এবং হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে মানবতার কল্যাণে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, যাবতীয় পাপাচার ও অন্যায় থেকে বিরত থেকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (স.) সন্তুষ্টি অর্জনই মুমিনের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। এই ওরশ শরীফ থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে ত্যাগের, সংযমের এবং সৃষ্টির সেবার।
ওরশ শরীফের সার্বিক তত্ত্বাবধান ও ১০ দিনব্যাপী কর্মসূচির বিষয়ে নায়েব সাজ্জাদানশীন সৈয়দ ইরফানুল হক মাইজভাণ্ডারী বলেন, আমরা চেষ্টা করেছি আগত মেহমানদের সর্বোচ্চ সেবা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারীর ২০০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে এবার আমরা গতানুগতিক আনুষ্ঠানিকতার বাইরে এসে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান ও কর্মসংস্থানের ওপর জোর দিয়েছি। ফটিকছড়িকে থ্যালাসেমিয়া মুক্ত করার উদ্যোগ এবং বেকারদের স্বাবলম্বী করতে ‘কর্জে হাসানা’র মতো কার্যক্রমগুলো মাইজভাণ্ডারী ত্বরিকার আধুনিক রূপ।

তিনি বলেন, প্রশাসনের সর্বস্তরের কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং হাজারো স্বেচ্ছাসেবক দিনরাত পরিশ্রম করে এই বিশাল আয়োজন সফল করেছেন। আমি তাদের সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।
আখেরি মোনাজাতে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন খান এগ্রো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলহাজ্ব সৈয়দুল হক খান, ফনিক্স শিপিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্যাপ্টেন সৈয়দ সোহেল হাসনাত, চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক জহিরুল ইসলাম চৌধুরী আলমগীর, মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবু তাহের, শাহজাদা সৈয়দ এরহাম হোসাইন ও শাহজাদা সৈয়দ মানাওয়ার হোসাইন।
আঞ্জুমানে মোত্তাবেয়ীনে গাউছে মাইজভাণ্ডারী (শাহ এমদাদীয়া) কেন্দ্রীয় কার্যকরী সংসদের সচিব শেখ মুহাম্মদ আলমগীরের পরিচালনায় ওরশে মিলাদ পরিচালনা করেন দারুত তায়ালীম প্রধান শিক্ষক মওলানা জয়নাল আবেদীন ছিদ্দিকী।
১০ দিনব্যাপী কর্মসূচি ও ব্যবস্থাপনা: এর আগে ওরশ উপলক্ষে ১০ দিনব্যাপী নানামুখী কর্মসূচি পালন করা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল—ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প, জাতীয় তাসাউফ গবেষণা কনফারেন্স, শিক্ষা উৎসব ও বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড, এথিকস অলিম্পিয়াড, থ্যালাসেমিয়া সচেতনতা সেমিনার ও রক্তদান কর্মসূচি, দক্ষতা উন্নয়নে ‘কর্জে হাসানা’র আওতায় সিএনজি ও সেলাই মেশিন বিতরণ এবং আন্তর্জাতিক ছবি প্রদর্শনী।
এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নে সহযোগিতা করে আঞ্জুমানে মোত্তাবেয়ীনে গাউছে মাইজভাণ্ডারী (শাহ এমদাদীয়া), মাইজভাণ্ডার ওরশ শরীফ সুপারভিশন কমিটি, দারুল ইরফান রিসার্চ ইনস্টিটিউট (ডিরি), মাইজভাণ্ডারী ফাউন্ডেশন, মাইজভাণ্ডারী এডুকেশন ট্রাস্ট, মাইজভাণ্ডারী শাহ এমদাদীয়া ব্লাড ডোনার্স গ্রুপ, মাইজভাণ্ডারী শাহ এমদাদীয়া স্বনির্ভরতা ট্রাস্ট, শাহ এমদাদীয়া অটো ড্রাইভিং স্কুল, মাইজভাণ্ডারী প্রকাশনী, গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারী হিফজুল কোরআন ফাউন্ডেশন, গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, মাইজভাণ্ডার আহমদিয়া এমদাদীয়া মাদরাসা এবং অন্যান্য সহযোগী সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানগুলো।
নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মাইজভাণ্ডার ওরশ শরীফ সুপারভিশন কমিটির উদ্যোগে পুরো এলাকা সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়। আগতদের সুবিধার্থে গাড়ি পার্কিং, বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন, আলোকসজ্জা ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ব্যবস্থার পাশাপাশি বিশেষজ্ঞ ডাক্তারসহ মেডিকেল টিমের ব্যবস্থা ছিল। ভক্তদের নিরাপত্তায় পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সার্বক্ষণিক নিয়োজিত ছিলেন।