উম্মী' (الْأُمِّيِّ) আরবি শব্দ, যার আভিধানিক অর্থ 'মা' থেকে জন্ম নেওয়া প্রাকৃতিক অবস্থাপন্ন বা নিরক্ষর। কেউ কেউ ইমাম (امام) শব্দ থেকে উম্মী শব্দের উৎপত্তি বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন। ইসলামিক পরিভাষায় এটি আখেরি নবী মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নির্দেশ করে, যিনি পার্থিব কোনো মানুষের কাছে শিক্ষা গ্রহণের অমুখাপেক্ষী ছিলেন। কোনো পার্থিব শিক্ষকের সাহায্য ছাড়া সম্পূর্ণ মানবজাতির শিক্ষক হয়ে পথনির্দেশ প্রদান করা ছিল তাঁর মু'জিজা (অলোকিক ঘটনা)। আমরা যারা সাধারন মানুষ তাদের জন্য বিদ্যা অর্জন করতে হলে মাধ্যমের স্মরনাপন্ন হওয়া ছাড়া গতি নেই। অক্ষরজ্ঞানের মাধ্যম ব্যতীরেকে জ্ঞান অর্জনের বিষয়টি আমাদের কল্পনারও অতীত এক অসম্ভব বিষয়। অথচ আমাদের প্রাণপ্রিয় নবীজীকে(সঃ) আল্লাহতালা বিশেষ নেয়ামত প্রদান হিসেবে অক্ষর জ্ঞানের অমুখাপেক্ষী রূপে সৃষ্টি করেছেন। এটি খাতামুননাবিয়্যিন, সাহেবে শরাহ, রাহমাতাল্লিল আলামিন রসুলে পাক হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা আহম্মদ মুজতবা (সঃ) এর একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ মর্যাদা। উম্মী শব্দের অর্থ মূর্খ নয় বরং এর আসল অর্থ হলো যিনি অক্ষরজ্ঞানের অমুখাপেক্ষী।
প্রাচীনকালে পুরো আরব জাতিকেই 'উম্মি' বলা হতো, কারণ তৎকালীন সময়ে আরবরা সাধারণত লিখতে, পড়তে বা হিসাব-নিকাশ করতে জানত না। মক্কার প্রাচীন নাম ছিল 'উম্মুল কুরা' (জনপদের কেন্দ্রস্থল); এই শহরের অধিবাসী বা সম্পৃক্ততা বোঝাতেও অনেক সময় উম্মী শব্দের উৎপত্তি ধরা হয়।
ধর্মগ্রন্থ না পাওয়া জাতিকেও 'উম্মি' শব্দ দিয়ে বুঝানো হয় অর্থাৎ যে সম্প্রদায়ের কাছে পূর্বে কোনো আসমানি কিতাব বা নবী পাঠানো হয়নি। আল-কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে 'উম্মী নাবী' শব্দগুচ্ছ ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন- সূরা আল আরাফের ১৫৭-১৫৮ আয়াত (৭:১৫৭-১৫৮) এবং সূরা আল জুমুয়াহ এর ২ নং আয়াত (৬২:২) ইত্যাদি। আরবরা এমন সম্প্রদায়, যাদের অধিকাংশই লেখা পড়া জানতো না। পবিত্র কুরআন নাযিল হওয়ার পূর্বে তাদের নিকট কোন কিতাব ছিল না। একারণে তাদেরকে উম্মি বলা হয়।
০২. উম্মী নামের তাৎপর্য:
মহান আল্লাহ উম্মী নবী রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’কে সমগ্র বিশ্বের শিক্ষকরূপে প্রেরণ করেছিলেন, “আমি শিক্ষক হিসেবে প্রেরিত হয়েছি।” (দারিমী, মিশকাতুল মাসাবীহ)। “আমি উত্তম চরিত্রের পূর্ণতা দানের জন্য প্রেরিত হয়েছি, উত্তম চরিত্রের পূর্ণতা দানের জন্য আল্লাহ আমাকে প্রেরণ করেছেন।” (শারহুস সুন্নাহ, বরাত মিশকাতুল মাসাবীহ)। আনুষ্ঠানিক লেখাপড়া ব্যতিরেকে মুআল্লিম নিযুক্তি আল্লাহ কর্তৃক সরাসরি শিক্ষাদানের মাধ্যমেই হয়েছে।
০২.১ “উম্মী” শব্দের তাত্ত্বিক পর্যালোচনা
امي = ي + ام
“উম্ম” শব্দ দিয়ে জননীকে বুঝানো হয়। জনকের বিপরীতে জননী। সরাসরি জন্মদাত্রী যেমন জননী, তেমন তার মাধ্যমে আসা ঊর্ধ্বতন মহিলাগণকেও জননী বলা হয়। এই অর্থে যদি আদি মানবী হাওয়া (আঃ) কে আমাদের আদি মাতা বলে অভিহিত করা হয়, যদিও তার ও আমাদের মাঝে বহু মহিলার দূরত্ব রয়েছে।
এভাবে অস্তিত্বের দিক দিয়ে, লালন-পালন, সংশোধন কিংবা সূচনার দিক দিয়ে প্রত্যেক মূল জিনিসকে “উম্ম” বলা হয়। আরবি ব্যাকরণবিদ আল-খালীলের মতে, সকল প্রাসঙ্গিক বিষয়াবলী, যেগুলোকে কোন একটি জিনিসের সাথে সম্পর্কিত করা হয়, তাকে আরবিতে “উম্ম” বলা হয়। এ কারণে আল-লাওহুল মাহফুয (সংরক্ষিত ফলক) কে উম্মুল কিতাব বলা হয়েছে। কারণ সকল ইলম, জ্ঞান-বিজ্ঞান তার সাথে সম্পর্কিত, সেখান থেকে অস্তিত্ব লাভ করে। মকা নগরীকে “উম্মুল কুরা” বলা হয়। এ কারণে যে, তার নিন্মদেশ থেকে সমস্ত পৃথিবী বিস্তার লাভ করেছে।
“এইভাবে আমি তোমাদের কাছে কুরআন নাযিল করেছি আরবি ভাষায়, যাতে আপনি সতর্ক করতে পারেন মক্কা ও তার চারদিকের জনগণকে …” (সূরাহ আশ-শুরা, ৪২ : ৭)
সূরাহ আল-ফাতিহা’কে “উম্মুল কিতাব” বলা হয়, কারণ তা আল-কুরআনের একেবারে সূচনাতে রয়েছে।
শেষ ঠিকানা অর্থেও উম্মু শব্দের প্রয়োগ রয়েছে। আল-কুরআনে বলা হয়েছে –
“তার ঠিকানা হবে হাবিয়া।” (সূরাহ আল-কারিআহ, ১০১ : ৯)
০২.২ উম্মাহ (امة)
“উম্ম” শব্দমূল থেকে উদগত হয়েছে “উম্মাহ” শব্দটি। উম্মাহ বলা হয় যে কোন একটি বিষয়ের ভিত্তিতে একটি দল বা কোন বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ ব্যক্তি-গোষ্ঠীকে, তা একটি দ্বীনের ভিত্তিতে হোক কিংবা একটি কালের ভিত্তিতে বা স্থানের ভিত্তিতে। এই ঐক্য হোক ইচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায়। এর বহুবচন হলো “উমাম”।
“এভাবে আমি তোমাদেরকে এক মধ্যমপন্থী জাতিরূপে প্রতিষ্ঠিত করেছি, যাতে তোমরা মানবজাতির জন্য সাক্ষীস্বরূপ এবং রাসুল তোমাদের জন্য সাক্ষীস্বরূপ হয় …..” (সূরাহ আল-বাকারাহ, ২ : ১৪৩)
“সকল মানুষ ছিল একই উম্মতভুক্ত, এরপর আল্লাহ নবীগণকে সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করলেন ….” (সূরাহ আল-বাকারাহ, ২ : ২১৩)
“….. আল্লাহ ইচ্ছা করলে তোমাদেরকে এক উম্মত করতে পারতেন, কিন্তু তিনি তোমাদেরকে যা দিয়েছেন তা দিয়ে তোমাদেরকে পরীক্ষা করতে চান …..” (সূরাহ আল-মাইদাহ, ৫ : ৪৮)
“আর তোমাদের মধ্যে এমন একটা দল থাকা উচিত যারা আহবান জানাবে সৎকর্মের প্রতি, নির্দেশ দেবে ভাল কাজের এবং বারণ করবে অন্যায় কাজ থেকে, আর তারাই হলো সফলকাম।” (সূরাহ আলি ইমরান, ৩ : ১০৪)
“উম্মাহ” শব্দটিকে আল-কুরআনে বহুবার ব্যক্ত করা হয়েছে। প্রায় সকল ক্ষেত্রেই একই চিন্তা-চেতনায় বিশ্বাসী দল হিসেবে “উম্মাহ” শব্দের প্রয়োগ হয়েছে। (ইসলামী বিশ্বকোষ)
০২.৩ “উম্মী নবী” অর্থ কি?
উম্মী শব্দের সাধারণ অর্থ হলোঃ যে ব্যক্তি লিখতে জানে না এবং কোন গ্রন্থ অধ্যয়ন করতে পারে না।
এ অর্থেই আল-কুরআনে বলা হয়েছে –
“তিনিই উম্মীদের মধ্য থেকে একজন রসূল প্রেরণ করেছেন, যিনি তাদের কাছে পাঠ করেন তার আয়াতসমূহ, তাদেরকে পবিত্র করেন এবং শিক্ষা দেন কিতাব ও হিকমত, ইতিপূর্বে তারা ছিলো ঘোর পথভ্রষ্টতায় লিপ্ত।” (সূরাহ আল-জুমুয়াহ, ৬২ : ২)
আরবি ভাষাবিদ কুতরুব বলেনঃ উম্মীহ (امية) শব্দের অর্থ হলো অসচেতন (الغفلة) ও অজ্ঞ (الجهالة)। আর এটি থেকে উম্মী শব্দটি উদগত হয়েছে, যার অর্থ হলো “স্বল্প জানাশোনা লোক”। এ অর্থে আল-কুরআনে বলা হয়েছে –
“তাদের মধ্যে এমন কিছু স্বল্প জানা লোক আছে, যাদের মিথ্যা আশা ছাড়া কিতাব সম্পর্কে কোন জ্ঞান নেই, তারা তো শুধু অমূলক ধারণা পোষণ করে।” (সূরাহ আল-বাকারাহ, ২ :৭৮)
আয়াতটির অনুবাদ এমন হয় যে, তাদের কাছে পাঠ করার পূর্বে তাদের কিতাবটি সম্পর্কে কোন জ্ঞান ছিল না। কারণ امنية শব্দের অর্থ কিরাআত পাঠ করা অর্থেও প্রয়োগ হয়।
ব্যাকরণবিদ আল-ফাররা বলেনঃ উম্মী হলো সেই আরবজাতি, যাদের কাছে কোন আসমানি গ্রন্থ ছিল না। কেউ কেউ বলেন, উম্মী শব্দটি امة শব্দের সাথে সম্বন্ধযুক্ত নাম। এই অর্থে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য উম্মী শব্দের প্রয়োগের সার্থকতা হবে, যেহেতু তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এমন উম্মাহ বা জাতির প্রতি প্রেরিত হয়েছিলেন যারা লেখাপড়া জানতো না। কেউ কেউ মনে করেন, উম্মুল কুরা (ام القري) শব্দের সাথে সম্পর্ক করে উম্মী বলা হতো। উম্মুল কুরা বলতে মক্কা নগরীকে বুঝায়। সেখানকার অধিবাসী সাধারণ জনগণ সকলকেই উম্মী বলে আখ্যায়িত করা হতো, যে কারণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’কেও উম্মী বলা হতো।
কেউ কেউ ইমাম (امام) শব্দ থেকে উম্মী শব্দের উৎপত্তি বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন। তাদের যুক্তি হলো, মানুষ বা গ্রন্থ যারই অনুসরণ করা হয় তাকে ইমাম বলা হয়, তা কথায় বা কাজে বা অন্য যে কোন পন্থায় হোক না কেন। এই অনুকরণ যে শুধু সত্য পন্থায় হতে হবে তা নয়, বরং বাতিল পন্থায় কারো অনুসরণ করা হলে সে ক্ষেত্রেও ইমাম শব্দের প্রয়োগ দেখা যায়। (লিসানুল আরাব, ১খ.)
“সেদিন আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়কে তাদের নেতাসহ ডাকবো ….” (সূরাহ আল-ইসরা, ১৭ : ৭১)
” ….. নিশ্চয়ই আমি তোমাকে মানবজাতির জন্য একজন নেতা বানাবো …..” (সূরাহ আল-বাকারাহ, ২ : ১২৪)
সাধারণভাবে উম্মী বলা হয় অক্ষরজ্ঞানহীন ব্যক্তিকে, যার দ্বারা লেখাপড়া কোনটিই সম্ভব নয়। আরবি ভাষায় একে নিন্মোক্ত বাক্য দ্বারা ব্যক্ত করা হয় –
هو الذي لم يكن يكتب ولا يقرا من كتاب
“যে ব্যক্তি কোন ধরনের গ্রন্থ লিখতে ও পড়তে সক্ষম নয়।”
এই লিখতে ও পড়তে না পারার কারণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’কে উম্মী বলা হতো। তার (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এই লেখাপড়ায় অক্ষম হওয়া তার (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জন্য ত্রুটিযুক্ত ছিল না, বরং তা ছিল তার (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ফযিলত ও শ্রেষ্ঠত্বের পরিচায়ক। লিখতে ও পড়তে অক্ষম হওয়া সত্ত্বেও তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যে মহান আল্লাহ’র বাণী বহন করতেন আর মানবজাতির কাছে তা পৌঁছিয়ে দিতেন, তা প্রমাণ করে যে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সরাসরি আল্লাহ’র সংরক্ষণ ও তত্ত্বাবধানে জ্ঞানার্জন করেন। এ ব্যাপারে আল-কুরআনে বলা হয়েছে –
“আমি আপনাকে পাঠ করাতে থাকব, ফলে আপনি বিস্মৃত হবেন না। – আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন তা ছাড়া …” (সূরাহ আল-আলা, ৮৭ : ৬-৭)
(আল মুফরাদাত ফী গারীবিল কুরআন)
কোন কোন প্রাচ্যবিদের মতে, উম্মী বলা হয় সেই লোককে, যার লিখিত কোন গ্রন্থ নেই। উম্মী শব্দের এই সংজ্ঞা দুরভিসন্ধিমূলক, কারণ এই সংজ্ঞার মাধ্যমে এই কথা প্রমাণ করার প্রয়াস চালানো হয়েছে যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রয়োজনীয় লেখাপড়া জানতেন, তবে তা গ্রন্থ রচনার পর্যায়ের ছিলো না। এই বক্তব্য আদৌ যথার্থ নয়।
০২.৪ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের 'উম্মী' অর্থে মতানৈক্য:
উপরিউক্ত আলোচনার ভিত্তিতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উম্মী হওয়ার বিষয়টির প্রতি দৃষ্টিপাত করলে অনুমিত হয় যে, বহু ক্ষেত্রে তাকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উম্মী হিসেবে আখ্যায়িত করার অবকাশ আছে। তবে লেখাপড়া না জানা অর্থেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মী ছিলেন বলে বহু বিশেষজ্ঞ আলিম মনে করেন। তবে এই ব্যাপারে মতানৈক্য রয়েছে যে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) গোটা জীবনই নিরক্ষর ছিলেন কিনা ? একদল আলিম মনে করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রথমদিকে নিরক্ষর ছিলেন। এরপর আল্লাহ তাকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) লেখাপড়া শিখিয়ে দিয়েছিলেন। এ ধারণার সৃষ্টি হয় নবুওয়াতি জীবনে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনার বর্ণনার ধরণ থেকে। সারাজীবন উম্মী বা নিরক্ষর থাকেন বা না থাকেন – ওহী নাযিল হওয়া পর্যন্ত তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যে লেখাপড়া জানতেন না, এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই।
০২.৫ উম্মী হওয়া রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একটি মুজিযা-
মহান আল্লাহ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওয়াতের সত্যতা প্রমাণ করার জন্য তাকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অনেকগুলো মুজিযা দান করেছিলেন। সেগুলো মধ্যে অন্যতম মুজিযা হলো, তাকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পূর্ব থেকেই নিরক্ষর রাখা। জন্মলগ্ন থেকে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) চল্লিশ বছর পর্যন্ত কারো কাছে লেখাপড়া শিক্ষা করেননি। ফলে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) না কোন কিছু পাঠ করতে পারতেন আর না কোন কিছু লিখতে পারতেন। এমতাবস্থায় তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মক্কাবাসীদের কাছে চল্লিশ বছর অতিবাহিত করেন। এখানে বাস করে কোন শিক্ষিত লোকের কিংবা পূর্ববর্তী কোন কিতাবধারীর সংসর্গ লাভ করা সম্ভব নয়। মক্কায় তখন শিক্ষা-দীক্ষার তেমন চর্চা ছিলো না, বিখ্যাত কোন বিদ্যানিকেতনও ছিল না। এ কারণে তাদেরকে উম্মী জাতি বলে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন।
এখানকার অধিবাসীরাও মুশরিক ছিলো, যদিও তারা নিজেদেরকে ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম অনুসৃত দ্বীনে হানীফের অনুসারী বলে দাবী করতো। পূর্ববর্তী ধর্মানুসারী ইয়াহুদী ও নাসারাদের অস্তিত্বও মক্কায় ছিলো না যে, তাদের কাছ থেকে কিছু ধর্মীয় আচার-আচরণের কথা শুনে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কিছু একটা রচনা করে ফেলবেন।
চল্লিশ বছর পূর্তির পর হঠাৎ তার (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পবিত্র মুখ থেকে এমন বাণী উচ্চারিত হলো, যার কোন তুলনা তাবৎ বিশ্বের কোন লেখক-কবি-সাহিত্যিক কারো পক্ষে সম্ভব হয়নি। সাহিত্যের মান, বিষয়বস্তু ও অর্থের দিক দিয়ে সেটির মুকাবিলা করতে গোটা সৃষ্টিকুল অক্ষম হয়ে পড়ে। শব্দ চয়ন ও ভাষালংকার ইত্যাদি ক্ষেত্রে এমন অনুপম বাণী দেখে তদানীন্তন আরবের শ্রেষ্ঠ কবি-সাহিত্যিকরা বিস্ময়াভিভূত হয়ে পড়ে যে, সেটি তো কোন মানব রচিত গ্রন্থ নয়। গতানুগতিক শিক্ষা-দীক্ষাহীন নিরক্ষর এমন এক লোকের মুখ থেকে এ ধরনের কালাম নিঃসৃত হওয়া অবশ্যই সকল সমাজে অবাক হওয়ার মতো বিষয়।
এটিই প্রমাণ করে যে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যে বাণী শুনিয়েছিলেন, সেটি তার (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রচিত ছিল না, বরং সেটি ছিল আল্লাহ’র কালাম, আল্লাহ’র কাছ থেকে প্রাপ্ত – যেটির মুকাবিলা করা গোটা জগতের পক্ষে ছিল অসম্ভব, সেটিই তো তার (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একটি শ্রেষ্ঠ মুজিযা।
“আমি আমার বান্দার প্রতি যা নাযিল করেছি তাতে তোমাদের কোন সন্দেহ থাকলে তোমরা তার অনুরূপ কোন সূরা নিয়ে আসো, আর তোমরা যদি সত্যবাদী হও, আল্লাহ ছাড়া তোমাদের সকল সাহায্যকারীকে আহবান করো। যদি তোমরা তা না পারো, আর কখনো করতে পারবে না, তবে ভয় করো সেই আগুনকে – মানুষ ও পাথর হবে যার ইন্ধন, যা কাফিরদের জন্য প্রস্তুত রয়েছে।” (সূরাহ আল-বাকারাহ, ২ : ২৩-২৪)
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’কে উম্মী বলার কারণ সম্পর্কে নানাবিধ উক্তি রয়েছে। উম্মী শব্দটির বহুমুখী অর্থের কারণেই বিভিন্ন মতের সৃষ্টি হয়েছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে লেখাপড়া জানতেন না, এ সম্পর্কে কোন দ্বিমত নেই। কেবল ইয়াহুদী-নাসারা এ ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করেছে। আল-কুরআনে বলা হয়েছে,
“আপনি তো এর পূর্বে কোন কিতাব পাঠ করেননি এবং নিজ হাতে কোন কিতাব লিখেননি যে, মিথ্যাচারীরা সন্দেহ পোষণ করবে।” (সূরাহ আল-আনকাবুত, ২৯ : ৪৮)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবী ও রাসুল হওয়ার গুণের সাথে তৃতীয় একটি গুণের কথা উল্লেখ রয়েছে, তা হলো তার (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উম্মী হওয়া। সাধারণ আরবদেরকে এ কারণে উম্মী বলা হতো যে, তাদের মধ্যে লেখাপড়ার প্রচলন ছিল না। তবে অন্যান্য সকল মানুষের জন্য লেখাপড়া না জানা ছিল দূষণীয়, কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য ছিল তা প্রশংসার বিষয়।
নবুওয়াত প্রাপ্তির লগ্নে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যে নিরক্ষর ছিলেন এ ব্যাপারে কারো দ্বিমত নেই। কিন্তু পরবর্তীকালে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কি সাক্ষরদানে সমর্থ হয়েছিলেন – এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ আলীমগণের মতবিরোধ রয়েছে। এ বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে তার (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কিছু উক্তি থেকে, যেমন – ওহী নাযিলের নাযিলের সূচনালগ্নে যখন জিবরীল আলাইহিস সালাম তাকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পাঠ করতে বললেন, তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উত্তর দিলেন – “আমি পড়তে জানি না”। প্রথমবার ও দ্বিতীয়বার পাঠ করার কথা বললে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একই উত্তর দিলেন এবং জিবরীল আলাইহিস সালাম তার (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মধ্যে পাঠ করার শক্তি সৃষ্টির লক্ষ্যে তাকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আলিঙ্গন করলেন। আইশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত। ওহী নাযিলের সূচনাকালীন বিভিন্ন সময়ের বিবরণমূলক দীর্ঘ হাদিসের নিন্মোক্ত অংশ এ স্থলে প্রমাণস্বরূপ উপস্থাপন করা যায় –
“তার কাছে ফেরেশতা এসে বললেন – পড়ুন। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হেরাগুহায় অবস্থানরত ছিলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন – আমি পড়তে পারি না। তিনি বলেন – তারপর তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে এমনভাবে চাপ দিলেন যে, আমার খুবই কষ্ট হলো। এরপর তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন – পড়ুন। আমি বললাম – আমি তো পড়তে পারি না। তিনি দ্বিতীয়বার আমাকে জড়িয়ে ধরে এমনভাবে চাপ দিলেন যে, আমার ভীষণ কষ্ট হলো। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন – তৃতীয়বার তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে চাপ দিলেন। এরপর ছেড়ে দিয়ে বললেন –
‘পড়ুন আপনার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে আলাক (ঝুলন্ত রক্তপিণ্ড) থেকে। পড়ুন আপনার রব মহিমান্বিত।’ (সূরাহ আল-আলাক, ৯৬ : ১-৩) ” (বুখারী, ১খ.)
এই আলিঙ্গনের ফলে তার (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অন্তরাত্মা খুলে গেলো। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পড়া শুরু করলেন। জিবরীল আমীনের উত্তরে তার (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) লেখাপড়া না জানার কথা বলায় নবুওয়াত প্রাপ্তিকাল পর্যন্ত তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যে উম্মী ছিলেন, তা তো দিবালোকের মতো প্রতিভাত হচ্ছে। আর নবুওয়াত লাভের সূচনালগ্নের এ ঘটনাটি হাদিসের সকল গ্রন্থে এমনভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, তাতে সন্দেহ পোষণের সুযোগ নেই।
জিবরীল আলাইহিস সালামের আলিঙ্গনের পর তার (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অন্তরাত্মা কি এ পরিমাণ খুলে গিয়েছিলো যে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পড়ার সাথে লিখাও শুরু করে দিয়েছিলেন ? হাদিস দিয়ে তো তার (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পঠনশক্তির কথা প্রমাণিত হয়। আর এই পঠনশক্তি অন্যের কোন লেখা দেখে পড়তে সক্ষম হওয়াকে বুঝায় না। জিবরীল আলাইহিস সালাম যা শুনাতেন, যা মুখস্ত করাতেন – তা তার (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অন্তরে অংকিত হয়ে যেতো। এরপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তা অন্যদের কাছে ব্যক্ত করতে পারতেন। প্রথমদিকে দিকে তার (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কাছে ওহী আসতো, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জিবরীল আলাইহিস সালামের সাথে মুখস্ত করার লক্ষ্যে পড়া শুরু করে দিতেন। কিন্তু আল্লাহ’র পক্ষ থেকে নিষেধাজ্ঞা আসে যে, এমন করার প্রয়োজন নেই, জিবরীল পাঠ করার সময় যেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নীরবতা অবলম্বন করেন, কেবল ধ্যানের সাথে তা শুনেন, বাকি দায়িত্ব আল্লাহ’র। কুরআনে বলা হয়েছে –
“তাড়াতাড়ি ওহী আয়ত্ত করার জন্য আপনি আপনার জিহবা তার সাথে সঞ্চালন করবেন না। এটি সংরক্ষণ ও পাঠ করানোর দায়িত্ব আমারই। সুতরাং যখন আমি তা পাঠ করি আপনি সেই পাঠের অনুসরণ করুন। এরপর এর বিশদ ব্যাখার দায়িত্ব আমারই।” (সূরাহ আল-কিয়ামাহ, ৭৫ : ১৬-১৯)
এই আয়াতে আল্লাহ তার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’কে শিক্ষা দেন যে, আয়াতসমূহকে আপনার অন্তরে সংরক্ষণ করা আর হুবহু আপনার দ্বারা পাঠ করিয়ে দেওয়া আল্লাহ’র দায়িত্ব। আপনার কাজ হলো – নীরব থেকে শুনা। আর আপনাকে আবৃত্তি করা আর অন্যের কাছে পৌঁছিয়ে দেওয়ার শক্তি প্রদান করা হলো আল্লাহ’র দায়িত্বে।
এই আয়াতও স্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করছে যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পূর্ব থেকে লেখাপড়া জানা ব্যক্তি ছিলেন না। কারণ লেখাপড়া জানা ব্যক্তি পূর্ব থেকেই অবহিত থাকে অন্যের লেখা বা শিখানো কোন কিছুকে কিভাবে আত্মস্থ করতে হয়। পাঠশালার কোন শিক্ষানবীশকে যখন কিছু শিখতে বলা হয় তখন তার মাঝে যে অবস্থার সৃষ্টি হয়, ঠিক সেই অবস্থা ওহী প্রাপ্তির সূচনালগ্নে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মধ্যে ফুটে উঠেছিলো বলে প্রদত্ত আয়াতটি ঘোষণা করছে। নবীনদের মতো তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মুখস্ত করার জন্য আওড়াতে শুরু করে দিয়েছিলেন জিবরীল আমীনের আবৃত্তি করার সাথে সাথে। এরপর আল্লাহ তাকে শিখিয়ে দিলেন কিভাবে তা তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আত্মস্থ করবেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লিখতে-পড়তে জানতেন না, তবুও তাকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কি করে জিবরীল আলাইহিস সালাম পড়ার নির্দেশ দিলেন ? সেটি কি সাধ্যের বহির্ভূত বিষয়ে কোন ব্যক্তিকে বাধ্য করার পর্যায়ভুক্ত নয় ? সেটি আল-কুরআনের এই আয়াতের বিপরীত নয় কি ? –
“আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের বাইরে কোন কাজের জন্য বাধ্য করেন না ….” (সূরাহ আল-বাকারাহ, ২ : ২৮৬)
এ প্রসঙ্গে হাদিসবিদ ও সিরাতবিদগণের অভিমত হলো, তা প্রকৃতপক্ষে পড়ার নির্দেশ ছিলো না, বরং তার (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মনোযোগ আকর্ষণের একটি কৌশল ছিল মাত্র। তাতে ইঙ্গিত ছিল এ ধরনের কাজের জন্য ভবিষ্যত প্রস্তুতি গ্রহণের। এ কথায় আবারো প্রশ্ন উত্থাপিত হয় যে, যদি তাতে পড়ার প্রকৃত নির্দেশ না থেকে থাকে, তাহলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক “আমি পড়তে জানি না” বলে উত্তর দেওয়ার কারণ কি ? এর উত্তর হলো, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রশ্ন মুতাবেক উত্তর দিয়েছিলেন। যেহেতু তাকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পড়তে বলা হয়েছিলো, তাই তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যে পড়তে জানেন না, সেটাই তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ব্যক্ত করলেন। (সিরাতুল হালাবী, ১খ)
০২.৬ জিবরীল আলাইহিস সালাম কি কিছু দেখিয়ে পড়তে বলেছিলেন ?
জিবরীল আলাইহিস সালাম রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’কে কি কোন কিছু দেখে পাঠ করতে বলেছিলেন ? গরিষ্ঠ সংখ্যক বিশেষজ্ঞ আলীমগণের মতে জিবরীল আমীনের হাতে কোন কিছু ছিল না। কিন্তু একদলের মতে, জিবরীল আলাইহিস সালামের হাতে একটি গিলাফের অভ্যন্তরে আল-কুরআনুল কারীমের একটি কপি ছিলো। ইবন হিশাম এই অভিমত গ্রহণ করেছেন। (আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা, ১খ.)
০২.৭ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি লিখতেও শিখেছিলেন ?
আগেই বলা হয়েছে যে, একদল আলিম মনে করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পড়ার সাথে লেখাও শিখেছিলেন। তারা এই ব্যাপারে এমন কিছু দলীল উত্থাপন করেন, যেগুলোতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিভিন্ন রাজা-বাদশাহগণের কাছে পত্র লিখেছিলেন বলে উল্লেখ রয়েছে। যেমন কোন কোন রিওয়ায়াতে বর্ণিত আছে –
“রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসের কাছে চিঠি লিখেছিলেন।”
এ ধরনের কথা তার (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রেরিত প্রায় পত্রের ব্যাপারে ব্যক্ত করা হয়েছে। এমনকি এ ব্যাপারে হাদিসের রিওয়ায়েতও পাওয়া যায়। সহীহ মুসলিমের একটি অনুচ্ছেদের শিরোনাম হলো –
অনুচ্ছেদঃ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাফির রাজা-বাদশাহগণের কাছে পত্র লিখেছিলেন তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দানের নিমিত্ত। (সহীহ মুসলিম, ২খ.)
আনাস ইবন মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, আল্লাহ’র নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কিসরা, কায়সার, নাজ্জাশী ও এইরূপ সকল প্রতাপশালী ব্যক্তিবর্গের কাছে পত্র লিখেছিলেন তাদেরকে আল্লাহ’র দিকে দাওয়াত দেওয়ার নিমিত্ত। উল্লেখ্য যে, এই স্থলে নাজাশী বলতে সেই নাজ্জাশী উদ্দেশ্য নয়, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যার গায়েবানা জানাযার সালাত আদায় করেছিলেন। (মুসলিম, ২খ.)
এটি ছাড়া হুদায়বিয়ার সন্ধির ব্যাপারে যখন কাফিরদের পক্ষ থেকে চুক্তিনামা থেকে “মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ” (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শব্দটি মুছে ফেলার জন্য তীব্র আপত্তি উত্থাপিত হয়, তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু’কে তা মুছে ফেলার নির্দেশ দিলেন, কিন্তু আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু ঈমানে এতো বলীয়ান ছিলেন যে, তিনি বললেন – যে কথাটি মহাসত্য, সে কথাটি আমি আমার হাত দিয়ে কিভাবে মুছে ফেলতে পারি ? কাফিরদের এই আপত্তি আপনি বিনম্রতাস্বরূপ মেনে নিতে পারেন, কিন্তু আমার দ্বারা তা মুছে ফেলা সম্ভব না। ফলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ হাতে সন্ধির স্বার্থে তা মুছে দিলেন। এখানে প্রশ্ন উত্থাপিত হয় যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যদি লেখাপড়া না জানতেন, তাহলে কি করে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজ হাতে এই লিখাটি মুছে ফেললেন ? এ সম্পর্কিত রিওয়ায়াতটি হলো –
আল বারাআ ইবন আযিব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেনঃ আলী ইবন আবী তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু হুদায়বিয়ার চুক্তি দিবসে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও মুশরিকদের মধ্যে অনুষ্ঠিত চুক্তিটি লিখার দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি তাতে লিখেছিলেন – এই চুক্তিনামাটি আল্লাহ’র রাসুল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পক্ষে সাক্ষরিত হচ্ছে। মুশরিকরা আপত্তি উত্থাপন করলো যে, “রাসুলুল্লাহ” (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শব্দটি লিখিও না। যদি আমরা আপনাকে আল্লাহ’র রাসুল হিসেবে বিশ্বাস করতাম, তাহলে আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হতাম না। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু’কে বললেন – এ কথাটি কেটে দাও। আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন – আমি এমন না যে, তা মুছতে হিম্মত রাখি। এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ হাতে তা মুছে ফেললেন। (মুসলিম, ২খ.)
এখানে একটি লক্ষণীয় বিষয় যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু’কে নির্দেশ দিলেন “রাসুলুল্লাহ” শব্দটি কেটে দিতে, কিন্তু আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু তা অমান্য করলেন কিসের ভিত্তিতে ? অথচ এ কথা সুপ্রসিদ্ধ যে, “নির্দেশ পালন শিষ্টাচারের ঊর্ধ্বে।”
এই নির্দেশ তো সাধারণ কারো নয়, বরং সরাসরি আল্লাহ’র রাসুল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশ, যার (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নির্দেশ পালন করা সকলের জন্য অপরিহার্য। এর কারণ খুঁজতে গিয়ে ইবন হাযার আল-আসকালানী বলেনঃ আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু এ কথাটি উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই নির্দেশটি অবশ্য পালনীয় পর্যায়ভুক্ত ছিলো না। ফলে তিনি তা পালন করা থেকে বিরত থাকেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহ’র রাসুল, কিন্তু সন্ধির স্বার্থে কাফিরগণের আপত্তি রক্ষার্থে তা কেটে ফেলতে সক্ষম হয়েছিলেন। এই কেটে ফেলাকে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হয়তো সামগ্রিক স্বার্থে মেনে নিতে পারেন, কিন্তু আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু তা বরদাশত করতে পারলেন না।
তা ছাড়া সুনান নাসাঈ’র রিওয়ায়াতে বর্ণিত হয়েছেঃ সুহায়ল (যে কাফিরদের পক্ষে চুক্তি সাক্ষরের দায়িত্বশীল ছিল) প্রথমে আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু’কে শব্দটি কেটে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিলো। উত্তরে আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছিলেন – তিনি অবশ্যই আল্লাহ’র রাসুল, রাগে-ক্ষোভে তোমার নাক ধুলিধুসরিত হয়ে গেলেও তা সত্য। কসম আল্লাহ’র, আমি তা কাটতে পারবো না। তাতে বুঝা গেলো, কাটার নির্দেশ ছিলো প্রথমে সুহায়লের পক্ষ থেকে। এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আপাতত বিতর্ক এড়াতে এই নির্দেশ দিয়েছিলেন। সুহায়লের উত্তরে মূলত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু অসম্মতি জ্ঞাপন করেছিলেন। পরবর্তীতে যখন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাধ্য হয়ে সুহায়লের কথা মানার জন্য তাকে বললেন, তখন তিনি বুঝতে পারলেন যে, আসলে কথাটি সুহায়লেরই, ফলে তিনি অসম্মতি জ্ঞাপন করলেন। (ফাতহুল বারী, ৭খ.)
উপরোক্ত হাদিসে শুধু বলা হয়েছে – “মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজ হাতে মুছে দিলেন”। কিন্তু সহীহ মুসলিমেরই অপর একটি রিওয়ায়াতের শব্দগুলোর প্রতি লক্ষ্য করুন –
“আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু মুছতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে সেই স্থানটি দেখিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। তিনি তাকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তা দেখালে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তা মুছে দিলেন এবং ‘ইবন আবদিল্লাহ’ শব্দটি লিখে দিলেন।”
সহীহুল বুখারীর মাগাযী অধ্যায়ে ইসরাইল সূত্রে যে হাদিসটি এ হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে তা এরূপ –
“রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লিখতে লেগে গেলেন, অথচ তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ভালোভাবে লিখতে জানতেন না, এরপর লিখলেন ….” (বরাতঃ তাকমিলাতু ফাতহিল মূলহিম, প্রাগুক্ত, ৩খ.)
এই রিওয়ায়াতগুলো প্রমাণ করে যে, উত্তমরূপে লিখা না জানলেও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লিখতে জানতেন। আবুল ওয়ালীদ আল-বাজী এ ধরনের রিওয়ায়াতের বাহ্যিক বক্তের প্রতি লক্ষ্য করে বলেনঃ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ হাতেই লিখতেন, তবে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সুন্দর বর্ণে লিখতে সক্ষম ছিলেন না।
তার এই অভিমতের কথা সমসাময়িকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে সকলেই তার তীব্র বিরোধিতা করেন, এমনকি তাকে যিন্দিক বলেও অভিহিত করেন। তদানীন্তন স্পেনের (আন্দালুস) এই সকল উলামায়ে কিরামগণের বক্তব্য ছিল যে, এই লোকটি আল-কুরআনের বিরুদ্ধাচরণ করে তার বিপরীত মনোভাব পোষণ করেছেন। বিতর্কের এই ঝড় যখন গোটা দেশে ছড়িয়ে পড়ে তখন তথাকার শাসক উলামায়ে কিরামকে একত্রিত করে তাদের বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ করে দেন। আল-বাজী তার ইলমী যুক্তি-তর্ক দিয়ে সমসাময়িকগণের উপর বিজয়লাভ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তার বক্তব্য ছিলো, তার এই অভিমত আল-কুরআনের বিপরীত নয়, বরং তা আল-কুরআনের আলোকেই গ্রহণ করা হয়েছে। কেননা আল্লাহ বলেছেন –
“আপনি তো এর পূর্বে কোন কিতাব পাঠ করেননি এবং নিজ হাতে কোন কিতাব লিখেননি যে, মিথ্যাচারীরা সন্দেহ পোষণ করবে।” (সূরাহ আল-আনকাবুত, ২৯ : ৪৮)
এই আয়াতের বিষয়বস্তু আল-কুরআন নাযিল হওয়ার পূর্বেকার অবস্থার সাথে সম্পৃক্ত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উম্মী হওয়ার বিষয়টি যখন সাব্যস্ত হয়ে যায়, আর এর দ্বারা তার (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মুজিযা প্রমাণিত হয়, এর ফলে তার (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ব্যাপারে সন্দেহ পোষণের সকল পন্থা দূরীভূত হয়ে যায়। তখন শিক্ষাদান ব্যতীত লেখাপড়া জানতে কোন বাঁধা নেই। বরং কারো কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ না করেও যে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) লিখতে পড়তে জানতেন, সেটা হবে তার (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অন্য আরো একটি মুজিযা।
ইবন দিহয়া বলেনঃ এর ফলে উলামায়ে কিরামের বিরাট একটি দল আল-বাজীর অনুসারী হয়ে গেলেন। তাদের মধ্যে শায়খ আবু যার আল-হারাবী ও আবুল ফাতহ আন-নিশাপুরী উল্লেখযোগ্য। আফ্রিকা ও অন্যান্য অঞ্চলের বহু উলামায়ে কিরাম আল-বাজীর অনুকূলে অভিমত গ্রহণ করেছেন। কেউ কেউ এই অভিমতের পক্ষে ইবন আবী শায়বা ও উমার ইবন শাব্বাহ কর্তৃক মুজাহিদ সূত্রে আওন ইবন আবদিল্লাহ থেকে নিন্মোক্ত উক্তিটি বর্ণনা করেছেন –
“রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লেখা ও পড়া শিখার পূর্বে ইন্তেকাল করেননি।” (তাকমিলাতু ফাতহিল মুলহিম, প্রাগুক্ত, ৩খ.)
এই উক্তিটির বর্ণনাকারী মুজাহিদ (রহঃ) বলেনঃ আমি এই বিষয়টি আশ-শাবীর কাছে উল্লেখ করলে তিনি বললেন – উক্তিটি যথার্থ। আমিও তা শুনেছি যিনি তা বর্ণনা করেছেন। কাযী ইয়াজ বলেনঃ এমন কিছু হাদিস বর্ণিত পাওয়া যায়, যেগুলো থেকে প্রমাণিত হয় যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরবি বর্ণমালা চিনতেন এবং লিখনের সুন্দর পদ্ধতি সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। যেমন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ব্যক্তিগত সচিবকে নির্দেশ দিয়েছিলেন – “কলমটি তোমার কানে রেখে দাও, কারণ সেটা তোমার স্মৃতিকে অধিক প্রখরকারী হবে।”
আরো বর্ণিত আছে যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু’কে লক্ষ্য করে বলেছেন, “দোয়াতটি ফেলে দাও, কলমটি পরিবর্তন করো ‘বা’ বর্ণকে সোজা করে লিখো, ‘সীন’কে পৃথক রাখিও এবং ‘মীম’কে বাঁকা করে লিখিও না।”
আরো বর্ণিত আছে যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ” ‘বিসমিল্লাহ’ শব্দকে টেনে লিখিও না।”
এ সকল বিবরণ যদিও স্পষ্টভাবে এ কথা বুঝায় না যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ হাতে লিখেছিলেন, কিন্তু এ বিষয়টি প্রমাণিত হওয়া অসম্ভব না যে, আল্লাহ’র পক্ষ থেকে তাকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) লিখার কলাকৌশল শিখিয়ে দেওয়া হয়েছিলো। বর্ণিত আছে যে, তাকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সকল জিনিসের জ্ঞান দেওয়া হয়েছে। স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুখ থেকে নিঃসৃত হয়েছে – “আমাকে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকলেরই ইলম দেওয়া হয়েছে।”
কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ আলিম উপরিউক্ত রিওয়ায়াতসমূহকে দুর্বল বলে তা প্রত্যাখ্যান করেন। তাদের যুক্তি হলো, আল-কুরআনের আয়াত ও সহীহ হাদিসের বিপরীতে এ সকল কথা গ্রহণযোগ্য নয়। হুদায়বিয়ার সন্ধির প্রাককালে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ হাতে মুছে তদস্থলে “মুহাম্মাদ ইবন আবদিল্লাহ” লিখেছিলেন বলে যে রিওয়ায়াত উল্লেখ করা হয়েছে, সে সম্পর্কে জমহুর উলামার অভিমত হলো, হুদায়বিয়ার এই ঘটনা অবিচ্ছিন্ন কোন ঘটনা নয়। একই ঘটনা ভিন্ন ভিন্ন পন্থায় উদ্ধৃত হয়েছে। তাতে লেখক হিসেবে মুখ্য ব্যক্তি ছিলেন আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু। আল-মিসওয়ার রাদিয়াল্লাহু আনহু’র রিওয়ায়াতে এবং অন্যান্য বহু রিওয়ায়াতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, চুক্তিপত্রটি আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু লিপিবদ্ধ করেছিলেন। কিন্তু হাদিসে পাওয়া যায়, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা মুছে স্বয়ং তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) লিখেছিলেন। এর ব্যাখ্যা হলো, প্রকৃতপক্ষে আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু’ই তা লিখেছিলেন, কিন্তু বিষয়টির শীর্ষকর্তা ছিলেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। এজন্য রুপক অর্থে তার সাথে কথাটি সংযুক্ত করা হয়েছিলো। আরবী পরিভাষায় তাকে বলা হয় نسبة مجا زية (রুপক অর্থে সম্পর্কিত করা)।
সকল ভাষাতেই এ ধরনের রুপক অর্থের প্রচুর প্রমাণ রয়েছে। যেমন – কাজ করে কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ, আর বলা হয় – রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী এই কাজটি করেছেন।
“রাষ্ট্রপতি এই শহরটি প্রতিষ্ঠা করেছেন” – এ ধরনের উদাহারন এরূপ ক্ষেত্রে দেওয়া হয়। ঊর্ধ্বতন কর্তার সাথে কাজটি সম্পর্কিত করার কারণ হলো, তার নির্দেশে আর তারই প্রধান ভূমিকায় কাজটি সম্পাদিত হয়ে থাকে। এভাবে কোন কোন রাবী কর্তৃক রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে সম্পর্কিত করে এরূপ বলা – كتب الى قيصر وغيره রুপক অর্থে তার সাথে সম্পর্কিত করা হয়েছে। কারণ সরাসরি তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তো তা লিখেননি আর পৌঁছিয়ে দেননি, কিন্তু তার (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নির্দেশে পত্র দেওয়া হয়েছিলো, এ কারণে তার (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাথে সম্পর্কিত করা হয়েছে। যেমন আমাদের সময়ের রাষ্ট্রপ্রধানরা একে অপরের কাছে চিঠি লিখেছেন বলা হয়। কিন্তু প্রকৃত অর্থে তা লিখে তাদের সচিব। যেহেতু তার নির্দেশে আর অনুমোদনে কাজটি সম্পন্ন হয়েছে, আর সেটার সকল দায়-দায়িত্ব তার উপরই আরোপিত হবে, এজন্য তিনি লিখেছেন বলা হয়। আল-কুরআনের আলোকে এই ব্যাখ্যাই হলো সর্বোত্তম। কারণ তাতে তার উপাধি দেওয়া হয়েছে উম্মী বলে, এমনকি তার উক্তিও এমন রয়েছে –
“আমরা উম্মী জাতি, আমরা লিখতে ও হিসাব করতে জানি না।” (তাকী উসমানী, তাকমিলাতু ফাতহিল মূলহিম, ৩খ.)
০৩. শেষকথা
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মী ছিলেন এতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু উম্মী হওয়া সত্ত্বেও তিনিই (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হুদায়বিয়ার সন্ধির সময় নিজ হাতে “মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ” (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শব্দটি মুছে তদস্থলে “মুহাম্মাদ ইবন আবদিল্লাহ” সংযোজন করেছিলেন। হাদিসে এ বিষয়টি প্রতিভাত হয়েছে। তা ছিল নবী হিসেবে তার (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অন্যতম বৈশিষ্ট্য, একটি মুজিযা। মুজিযা তো সেটিই, যা সাধারনের কাছে অসম্ভব বলে বিবেচিত হয়, কিন্তু আল্লাহ তার নবীর সত্যতা প্রমাণের জন্য অস্বাভাবিক পন্থায় সেটি তার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দ্বারা বাস্তবায়ন করিয়েছেন। ইবন হাযার আল-আসকালানীর মত হলো, এ সম্পর্কিত হাদিসকে তাবীল না করে তার যাহিরী অর্থে প্রয়োগ করা উত্তম। (ফাতহুল বারী, ৭খ.)
০৩.১ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উম্মী হওয়া সম্পর্কে আহলে কিতাব সম্প্রদায়ের সংশয়:
আহলে কিতাব তথা ইয়াহুদী-নাসারাগণ মনে করে যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মী ছিলেন না। তাদের দাবী হলো, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লেখাপড়া জানা শিক্ষিত লোক ছিলেন। তাদের এই অযৌক্তিক দাবীর পিছনে কোন প্রমাণ নেই। মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উড়ে এসে জুড়ে বসা কোন লোক ছিলেন না যে, তার (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কে জানার কোন উপায় ছিলো না। যদি তাদেরকে প্রশ্ন করা হয়, আপনারা তাহলে ইতিহাসের ভিত্তিতে তার (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শিক্ষক বা প্রশিক্ষকের নামটি বলুন, যিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’কে সে সকল জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষা দিয়েছেন। অবশ্যই তা পারবেন না, কারণ সেটার পিছনে কোন বাস্তবতা নেই। অথচ তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তো এমন মহান ব্যক্তিত্ব ছিলেন, জন্মের পরপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সবার আগে যে মহিলার বুকের দুধ পান করেছিলেন, আজো সে ইতিহাস লিপিবদ্ধ আছে।
০৩.২ যারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’কে অক্ষরজ্ঞানী দাবী করেন, তাদের কাছে নিন্মোক্ত আরো কিছু প্রশ্ন রাখা হলো:
গোটা বিশ্বে মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইলম ও হিকমতের বিজয়বার্তা পৌঁছে যাবে, কিন্তু যার কাছ থেকে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এই ইলম শিক্ষা করলেন, তার নামও কেউই জানবে না, এটি কি সম্ভব কথা ? যোগ্য ছাত্রের দ্বারা শিক্ষাগুরুর প্রসার তো বেশী হয়ে থাকে। সুতরাং সে হিসেবে কিছু না কিছু তার সম্পর্কে জানার কথা। আরো বিস্ময়ের ব্যাপার যে, ইসলামের দাওয়াত দানের ক্ষেত্রে কতো লোক তার (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রাণের দুশমন পর্যন্ত হয়ে দাঁড়িয়েছিলো আর তার (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রচারিত বাণী সম্পর্কে কতো ধরনের আপত্তিকর কথাবার্তা তারা বলাবলি করলো, কিন্তু একটি দিনের জন্য হলেও তারা এই প্রশ্নটি উত্থাপন করলো না যে, মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অমুক শিক্ষক থেকে শিক্ষা করে এই সকল কথাবার্তা বলছেন।
শিক্ষার জন্য আবশ্যক হলো যে, শিক্ষার্থী বারবার শিক্ষকের কাছে গমনাগমন করবে, তার দিকনির্দেশনা মতো চলবে, তার সেবায়েত হিসেবে দরবারে আসা-যাওয়া করবে এবং দীর্ঘ একটি জীবন সেটার পিছনে ব্যয় করবে। আক্ষেপের বিষয়, আরবরা গোটা জীবনে তার (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শিক্ষা গ্রহণের বিষয় সম্পর্কে কোন তথ্যই পেলো না। অথচ ইয়াহুদী-নাসারারা তেরশত বছর পর অনুমাননির্ভর কথা দূর থেকে কিভাবে তার (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উপর চালিয়ে দিলো যে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শিক্ষিত ছিলেন তা বোধগম্য না। যে সমাজে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বড় হয়েছিলেন, চল্লিশ বছর পর্যন্ত সেখানে জীবনযাপন করেছেন, কোথায় কখন গিয়েছেন – তার (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সকল বিষয় স্পষ্ট ও জ্ঞাত ছিলো। এ সমাজেরই অংশ ছিলো আবু জাহল, আবু লাহাব, উতবা, শায়বা, উমায়্যা ইবন খালাফ প্রমুখ। তারা ছিলো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রাণের শত্রু। তারা তার (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সম্পর্কে কতো আপত্তিকর কথাবার্তা বলেছে, কিন্তু এমন কথা তো কখনো বলেনি যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লেখাপড়া শিখা লোক ছিলেন আর এই লেখাপড়ার জোরে তিনি এই আজিব গ্রন্থ রচনা করেছিলেন।
হেরা গুহায় তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ধ্যানে যেতেন, সেখানে কিভাবে খাবার গ্রহণ করতেন, কতদিন পরপর বাড়ীতে ফিরতেন ইত্যাদি কথা ইতিহাসে লিপিবদ্ধ। কিন্তু মক্কার কোন গলির কোন বিদ্যানিকেতনে গিয়ে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শিক্ষাগ্রহণ করেছেন, তার (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শিক্ষাগুরু কোন ব্যক্তি ছিলো তার কোন তথ্য কি ইয়াহুদী-নাসারারা দিতে সক্ষম হবে ? তাদের তদানীন্তন মিত্র মক্কার কুরাইশদের কাছে কি সেটার কোন প্রমাণ আছে ? সে মহান শিক্ষাগুরু থেকে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শিক্ষা গ্রহণ করে গোটা বিশ্বকে একটি মতবাদের দিকে দাওয়াত দিলেন, বিশ্বে সেটির বিপ্লব ঘটালেন, তখনকার শিক্ষিত সমাজের কাছে তো তা গোপন থাকার কথা ছিলো না। তারা তো তাওহীদের নতুন দাওয়াত শুনে যে স্থল থেকে তা আবিষ্কৃত হচ্ছিলো সেখানে হানা দিয়ে সেই গুরুকে তা থেকে নিবৃত্ত করতে পারতো। তখনকার শিক্ষিত রোম সাম্রাজ্যেও তো অতি দ্রুত মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের তাওহীদের দাওয়াত পৌঁছে গিয়েছিলো। তারা যদি মনে করতো, সেটা কলেজ ভার্সিটিতে পড়ুয়া কোন শিক্ষিত লোকের কাজ, তাহলে তার বিরুদ্ধে তারা একটি বিবৃতিও দিলো না। বরং তদানীন্তন পোপ হিরাক্লিয়াস ইসলামের দাওয়াত পেয়ে সেটার অনুকূলে যে ভাষণ দিয়েছিলেন তা তো ইয়াহুদী-খৃষ্টানদের কাছে অজানা থাকার কথা না। সম্রাট হিরাক্লিয়াস তার (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নবুওয়াতের পক্ষে যে ভাষণ দিয়েছিলেন, সেখানে তো বহু শিক্ষিত লোকের সমাবেশ ছিলো, কেউই তো তা শিক্ষিত লোকের আবিস্কার বলে অভিযোগ করেনি।
যে শিক্ষক মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’কে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকল কিছুর ইলম দান করলেন, তাওরাত ও ইনজিলের বিষয়বস্তু সম্পর্কেও জ্ঞান দিলেন, পূর্ববর্তী সকল নবী-রাসুলগণের শরীয়াতের শিক্ষা দিলেন, নিঃসন্দেহে তার কাছে একটি বিশাল গ্রন্থাগার থাকার কথা, কিন্তু আজো মক্কার সেই গোপনীয় গ্রন্থাগারটির তথ্য উদঘাটিত হলো না।
যদি তার (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কোন শিক্ষক থেকে থাকে, তাহলে বিশ্ববিখ্যাত একজন ছাত্র পেয়েও তিনি কি কারণে নীরব ছিলেন ? ব্যক্তিত্বশীল তো স্বাভাবিকভাবে কোন প্রসিদ্ধ ছাত্র পেলে তাকে নিয়ে গর্ববোধ করেন। মনের আনন্দে তা অন্যের কাছে প্রকাশ করেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শিক্ষাগুরু সেই কথা একবারও কারো কাছে বলে যান নাই যে, মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমার ছাত্র ছিল।
যদি তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কারো কাছ থেকে শিক্ষাগ্রহণ করে থাকেন, তাহলে তার তো অবশ্যই সহপাঠী থাকার কথা। একান্ত না হলে অন্তত দুই-একজন দর্শক থাকবে, যারা দেখেছে যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিদালয়ে গিয়ে বা অমুকের কাছ থেকে শিক্ষালাভ করেছেন। যখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মানুষকে তার (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নবুওয়াতের কথা বললেন, তখন চরম বিরোধিতার মুখেও কেউ এ তথ্য দিলো না যে – আমরা দেখেছি যে, এই লোকটি অমুক স্থানে গিয়ে অমুকের কাছ থেকে শিক্ষালাভ করেছেন।
তদানীন্তন পরিবেশ অনুযায়ী মানুষ তিন ধর্মের যে কোন এক শ্রেণীর অনুসারী হওয়া আবশ্যক ছিলো – মুশরিক বা ইয়াহুদী বা খৃষ্টান। যদি শিক্ষক মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকে, তাহলে তিনি কি করে তাওহীদের শিক্ষা ও তার দলীল, শিরকের অপকারিতা আর তার অসারতা সম্পর্কে ছাত্রকে শিক্ষা দিলেন ? গোটা কুরআন তো মুশরিকদের মূর্খতা আর তাদের গোমরাহীর বর্ণনায় পরিপূর্ণ রয়েছে, তিনি মুশরিক হলে অবশ্যই তা এমন হতে দিতেন না।
আর যদি তিনি ইয়াহুদী হতেন, তাহলে তিনি কি করে আল-কুরআনে ঈসা আলাইহিস সালামের সুন্দর জীবন ও তার ফযীলত আর তার পূত-পবিত্র মা মারিয়াম (আঃ) এর সতীত্ব সম্পর্কে শিক্ষা দিতেন ! আর ইয়াহুদীরা যে তাদের তাওরাতকে বিকৃত করেছে তার বিশদ বিবরণ কি আল-কুরআন জুড়ে এভাবে বিবৃত হতো ? এদিকে ইয়াহুদী লাঞ্ছনা-বঞ্চনার যে ইতিহাস আল-কুরআনে বিবৃত হয়েছে তা কি থাকতো ? অপরদিকে, যদি তিনি খৃষ্টান হতেন, তাহলে ত্রিত্ববাদ আর ঈসা আলাইহিস সালামের ইলাহ হওয়ার দাবীটি যে বাতিল, তা কি করে আল-কুরআনে বিবৃত হতো ? আর ঈসা আলাইহিস সালাম’কে হত্যা করার আর শূলীকাষ্ঠে ঝুলানোর ঘটনাটি মিথ্যা বলে কিভাবে ব্যক্ত হতো ? এ সকল অলীক কাহিনী প্রকাশ করে ঈসা আলাহিস সালাম’কে আকাশে উঠানোর বিষয়টি কিভাবে সুন্দর করে আল-কুরআনে উপস্থাপিত হতো ? (ইদ্রিস কান্ধালাবী – মাআরিফুল কুরআন, ৬খ.)
০৩.৩ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি কাব্যচর্চার অভিযোগ:
আল-কুরআনুল কারীম নাযিল হওয়ার প্রারম্ভিককালে মক্কার অবিশ্বাসীরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’কে কবি হওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত করে। তাদের বিশ্বাস ছিলো, অপূর্ব বাচনভঙ্গিতে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যা আবৃত্তি করছেন, তা কাব্য ছাড়া কিছুই না, আর তার রচয়িতাও একজন কবি হয়ে থাকবেন। আল্লাহ তাদের এই অভিযোগকে স্পষ্টভাবে অবাস্তব বলে ঘোষণা করেন –
“আমি তাকে কাব্য রচনা করতে শিখাইনি আর সেটা তার পক্ষে শোভনীয়ও না; এটি তো কেবল এক উপদেশ ও সুস্পষ্ট কুরআন।” (সূরাহ ইয়া-সীন, ৩৬ : ৬৯)
“আর এটি কোন কবির রচনা নয়, তোমরা অল্পই বিশ্বাস করো।” (সূরাহ আল-হাক্কাহ, ৬৯ : ৪১)
এ স্থলে উল্লেখ্য যে, “وَمَا يَنبَغِي لَهُ” (তার পক্ষে শোভনীয়ও নয়) – এর ব্যাখ্যায় মুফাসসিরগণ বলেন –
“তার (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পক্ষে কাব্য রচনা সহজসাধ্য নয়, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাতে সক্ষম হবেন না। তাকে আমি এমনভাবে রূপায়িত করেছি যে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইচ্ছা করতে চাইলেও তাতে সক্ষম হবেন না এ সম্পর্কে প্রকৃতিগত ও অভিজ্ঞতালব্ধ যোগ্যতা না থাকায়।”
এ সম্পর্কে হাদিসে বর্ণিত হয়েছেঃ আইশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত হয়েছে, তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিলো যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোন ধরনের কবিতা দিয়ে উপমা দিতেন কিনা। তিনি উত্তর দিয়েছিলেন যে – তার (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কাছে সর্বাধিক ঘৃণিত বিষয় ছিল কবিতা। আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহার এই পংক্তিটি ছাড়া তিনি অন্য কোন কবিতা দিয়ে উপমা দেন নাই –
ستبدي لك الا يام ما كنت جاهلا – ويأ تيك بالا خبار من لم تزور
“তুমি যে বিষয়ে মূর্খতায় ছিলে তার যুগ অচিরেই প্রকাশ করে দিবে, আর তুমি যে সম্বল সংগ্রহ করোনি তার সংবাদও নিয়ে উপস্থিত হবে।”
এ পংক্তিটি আবৃত করার সময় তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) “ويأ تيك” এর স্থলে “وما يأتيك بالا خبار” বলতে শুরু করলেন। তখন আবু বকর তা শুনে বললেন, আপনি যেভাবে তা আবৃত্তি করছেন, তা যথাযথ হয়নি ইয়া রাসুলাল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, “আমি তো কবি নই আর তাতে সক্ষমও নই।” (পাদটীকা তাফসীরুল জালালায়ন, ইন্ডিয়ান সংস্করণ, উক্ত আয়াতের তাফসীর দ্রষ্টব্য)
০৩.৪ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ছন্দবদ্ধ কথা:
ক্ষেত্রবিশেষে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুখ থেকে ছন্দবদ্ধ কথা বের হয়ে আসতো যা কবিতার মতো মনে হয়। সেটি তার (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কবি হওয়ার প্রমাণ বহন করে না। যেমন, হুনায়ন যুদ্ধের সময় কাফিরদের তুমুল আক্রমণের মুখে অন্যরা পিছপা হতে লাগলো, কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ স্থানে অবিচল থেকে ছন্দাকারে বলতে লাগলেন –
انا النبي لا كذب – وانا ابن عبد المطلب
“আমি সত্য সত্যই নবী, আমি আবদুল মুত্তালিবের বংশধর।”
কোন এক যুদ্ধে অংশগ্রহণের সময় হোঁচট খেয়ে তার (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একটি আঙ্গুল আহত হলে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলতে লাগলেন –
هل انت الا اصبع رميت – وفي سبيل الله ما قد لقيت
“তুমি তো একটি আঙ্গুল মাত্র রক্তাক্ত হয়েছো, তুমি যে কষ্ট ভোগ করলে তা তো আল্লাহ’র পথে।”
এ সম্পর্কে বিশিষ্ট তাফসীরবিদ কুরতুবী বলেনঃ ক্ষেত্রবিশেষে কবিতা আবৃত্তি করতে সক্ষম হওয়ায় এ কথা প্রমাণিত হয় না যে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কবি ছিলেন। অন্য কথায়, তা তো কবিতাই ছিলো না। একান্তই যদি মেনে নেওয়া হয় যে, তা কবিতা ছিলো, তা হলেও বলা যায়, কবিতা আবৃত্তি করতে পারা এ কথা বুঝায় না যে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কবিতা বিশেষজ্ঞ ছিলেন আর তিনি একজন কবিও বটে।
কেউ কেউ বলেন, মহান আল্লাহ তো ইরশাদ করেছেন যে, তিনি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’কে কবি হিসেবে তৈরি করেন নাই। তার অর্থ এই না যে, আল্লাহ তার (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কাছ থেকে অনিচ্ছাবশত কিছু কবিতা সৃষ্টির ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছেন। কেউ কেউ এরূপও বলেছেন – কোন ব্যক্তি ছন্দবদ্ধ এমন কোন বাক্য প্রয়োগ করলো অথচ তা দিয়ে তার কবিতা বলা উদ্দেশ্য নয়, তাহলে তাকে কবি বলা যাবে না। বড়জোর এ কথা বলা যায় যে, তার উক্তিটি কবিতার সাথে মিলে গিয়েছে।
আর-রাগিব আল-ইসফাহানী বলেনঃ আল-কুরআনুল কারীম যখন ছন্দময় বাক্য ও অনুপম শব্দের মিল সহকারে নাযিল হলো, তখন কিছু সংখ্যক অবিশ্বাসী অভিযোগ করে বসলো যে, তার বাহক মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হলেন একজন কবি। অথচ এর পূর্বে তার (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কবি সত্তার কোন অভিযোগ ছিল না। কেউ কেউ বলেন, অনেক অবিশ্বাসী পৌত্তলিক রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’কে কবি বলে তাকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মিথ্যাবাদী বলে বুঝাতো। কারণ কবিগণ বেশীরভাগ ক্ষেত্রে অবাস্তব ও মিথ্যা কথা কাব্যে প্রয়োগ করে থাকে। (হাশিয়া জালালায়ন, প্রাগুক্ত)
শরীফ আল-জুরজানী বলেনঃ মহান আল্লাহ’র বাণী – “আমি তাকে কবিতা শিক্ষা দেইনি” – এ বাক্যের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য হলো, আমি আল-কুরআন শিক্ষা দেওয়ার মাধ্যমে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে কবিতা শিখাইনি। অন্য কথায়, আল-কুরআন কোন কাব্যগ্রন্থ নয়। কারণ কবিতা হলো সৃজনশীল কৌশলী বাক্য, শব্দভাণ্ডারকে সুবিন্যস্তভাবে সাজিয়ে-গুছিয়ে তা সৃষ্টি করা হয়। অলীক কল্পনা ও বাস্তবতা বর্জিত ধ্যান-ধারণার সংমিশ্রণে তা তৈরি হয়ে থাকে। কিন্তু আল্লাহ’র কাছ থেকে নাযিলকৃত আল-কুরআনুল কারীম এ সকল কাল্পনিক বিষয় থেকে বহু দূরত্বে অবস্থিত। এ সকল কাব্যের সাথে সেটির তুলনাই তো ভাবনার ঊর্ধ্বে। (হাশিয়া জালালায়ন, প্রাগুক্ত)
সূত্রঃ সিরাত বিশ্বকোষ – ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ (ত্রয়োদশ খণ্ড) সহ অন্যান্য অন-লাইন সোর্সেস (সম্পাদনাসহ)