আ ফ ম বোরহন:
বিশ্ব পরিবেশ দিবস-২০২৬ এবং হযরত শাহসূফী সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারী (ক.)-এর ২০০তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) জলবায়ু সচেতনতা ও আধ্যাত্মিক দর্শনের এক অপূর্ব মেলবন্ধন সৃষ্টি হয়েছে। চবি’র ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগ এবং দারুল ইরফান রিসার্চ ইনস্টিটিউট (ডিরি)-এর যৌথ উদ্যোগে গত বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের কনফারেন্স কক্ষে দিনব্যাপী বিশেষ “গ্রাজুয়েট সিম্পোজিয়াম অন ওয়ার্ল্ড এনভায়রনমেন্ট ডে-২০২৬” অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সিম্পোজিয়ামে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) ও রুটিন দায়িত্বপ্রাপ্ত উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আল-আমীন। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. নুরুল ইসলাম। ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের সভাপতি প্রফেসর ড. কাজী মো. বরকত আলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন চবি উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) প্রফেসর ড. মো. সফিকুল ইসলাম, চবি জীববিজ্ঞান অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. এ.এম. মাসুদুল আজাদ চৌধুরী এবং দারুল ইরফান রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (ডিরি) ম্যানেজিং ট্রাস্টি ও চেয়ারম্যান শাহজাদা সৈয়দ ইরফানুল হক মাইজভাণ্ডারী। সিম্পোজিয়ামে কনভেনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন চবি ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ইকবাল সরোয়ার এবং কো-কনভেনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন শাহজাদা সৈয়দ ইরফানুল হক।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আল-আমীন আয়োজকদের শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, “বিশ্ব পরিবেশ দিবসের এই আয়োজনে জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি সুফিজম তথা আধ্যাত্মিকতাকে যুক্ত করার ধারণাটি অত্যন্ত চমৎকার ও সময়োপযোগী। পরিবেশ রক্ষা এবং ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন’-এর ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক ও আধ্যাত্মিক উভয় দৃষ্টিভঙ্গিই সমান গুরুত্বপূর্ণ।”
নিজের দীর্ঘ গবেষণার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমি নব্বইয়ের দশক থেকে জলবায়ু পরিবর্তন ও জিআইএস নিয়ে গবেষণা করছি। তবে দীর্ঘ ক্যারিয়ারে অনেক রিসার্চ পেপার লিখলেও মাঝে মাঝে আফসোস হয় যে, পরিবেশের অবক্ষয় রোধে মানুষকে সহজে জাগানো যাচ্ছে না। আমাদের দেশের মানুষের স্বভাব হলো, যতক্ষণ নিজের গায়ে বিপদ না পড়ে, ততক্ষণ তারা সচেতন হয় না।”
তিনি শিক্ষার্থীদের চমৎকার পোস্টার প্রেজেন্টেশন ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং পরিবেশ রক্ষার এই বার্তা সবার মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে চবি উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) প্রফেসর ড. মো. সফিকুল ইসলাম বলেন, “বর্তমান পৃথিবীতে মানব অস্তিত্বের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হলো জলবায়ু পরিবর্তন। ভৌগোলিক কারণে বাংলাদেশ এই ঝুঁকিতে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দেশ। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে আমাদের নিম্নভূমিগুলো পানিতে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে, যদিও এই সংকটের জন্য আমরা নিজেরা দায়ী নই। নির্বিচারে বন উজাড় ও কার্বন নিঃসরণের কারণেই আজ তাপমাত্রা বাড়ছে।” এই সংকট মোকাবিলায় সরকারি কর্মসূচির পাশাপাশি ব্যক্তিগত পর্যায়েও সবাইকে বেশি বেশি গাছ লাগানোর আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন অনুষ্ঠানের আহবায়ক প্রফেসর ড. মো. ইকবাল সরোয়ার। ডিরি’র পক্ষে বক্তব্য রাখেন মেম্বার সেক্রেটারি ড. কাজী সাইফুল আচফিয়া। উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধের ওপর আলোচনায় অংশ নেন ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের প্রফেসর ড. অলক পাল, প্রফেসর ড. মুহাম্মদ মুহিবুল্লাহ ও প্রফেসর ড. মো. আতিকুর রহমান; উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের প্রফেসর ড. শেখ বখতিয়ার উদ্দীন; মনোবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর ড. মো. শাহীনুর রহমান; বন ও পরিবেশবিদ্যা ইনস্টিটিউটের প্রফেসর ড. এ.এইচ.এম রায়হান সরকার; মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের সভাপতি মোহাম্মদ শের মাহমুদ; বাংলা বিভাগের প্রফেসর ড. মোহাম্মদ শেখ সাদী এবং ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মুনমুন নেছা চৌধুরী।
ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. তাজ সুলতানা ও প্রভাষক মোহাম্মদ আলীর যৌথ সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক, গবেষক এবং বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিলেন।
সিম্পোজিয়ামের অন্যতম মূল আকর্ষণ ছিল শিক্ষার্থীদের পোস্টার প্রেজেন্টেশন প্রতিযোগিতা। প্রতিযোগিতাটি দুটি মূল থিমে বিভক্ত ছিল, প্রথমটি 'পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস এবং জলবায়ু অভিযোজন' এবং দ্বিতীয়টি 'সুফিবাদ, পরিবেশবিদ্যা এবং সবুজ ভবিষ্যৎ'। এর অধীনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং ইকো-সুফিবাদ ও পরিবেশগত নৈতিকতার মতো গভীর ও ব্যতিক্রমী বিষয়গুলো গবেষকদের পোস্টারে চমৎকারভাবে ফুটে ওঠে। আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রতিটি থিম থেকে সেরা তিনটি পোস্টারকে আকর্ষণীয় পুরস্কারে ভূষিত করা হয় এবং সিম্পোজিয়ামের সার্বিক বিষয়বস্তুর ওপর ভিত্তি করে একটি প্রসিডিংস প্রকাশিত হয়।