
স্টার নিউজ ডেস্ক:
সারাদেশে গ্রামীণ এলাকার সড়কসমূহ রক্ষণাবেক্ষণ এবং দরিদ্র নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে ২,০৮২.১২ কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদনের জন্য জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় তোলা হচ্ছে।
আগামীকাল বুধবার অনুষ্ঠেয় এই সভায় সভাপতিত্ব করবেন একনেক চেয়ারপারসন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার বিভাগের আওতাধীন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ২০২৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে ২,০৮২.১২ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে প্রস্তাবিত এই ‘পল্লী সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ ও কর্মসংস্থান প্রকল্প’ বাস্তবায়ন করবে।
পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগ) মো. মাহমুদুল হোসাইন খান বাসসকে জানান, এর আগে ১৯৮৩ ও ১৯৮৪ সালে এবং পরবর্তীসময় ২০০৩-২০০৭ মেয়াদে এলজিইডি’র অধীনে সড়কসমূহের ব্যাপক সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়েছিল। এরপর আর বড় আকারের কোনো রক্ষণাবেক্ষণ কাজ হয়নি। বিষয়টি বিবেচনা করে দেশের ৬৪টি জেলার ৪৯৫টি উপজেলাকে অন্তর্ভুক্ত করে এই খসড়া প্রকল্প প্রস্তুত করা হয়েছে।
প্রকল্পটিকে ‘দরিদ্র নারী-বান্ধব’ এবং নারীর ক্ষমতায়নের সহায়ক হিসেবে উল্লেখ করে মো. মাহমুদুল হোসাইন খান আরও জানান, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে বছরজুড়ে ৯১ হাজার ৫৬০ কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ক যোগাযোগের উপযোগী রাখা এবং পরিবারপ্রধান ৪৫ হাজার ৭৮০ জন দরিদ্র নারীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাই এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য, যা সমসংখ্যক সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটাবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পরিকল্পনা কমিশনের আরেক কর্মকর্তা বলেন, কৃষিজাত ও অ-কৃষিজাত পণ্য বাজারে পরিবহনের জন্য বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি অনেকাংশেই একটি ভালো সড়ক নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল। তাই বছরব্যাপী যোগাযোগ নিশ্চিত ও বাণিজ্য সহজতর করতে এবং গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়নকে এগিয়ে নিতে গ্রামীণ সড়কের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ অত্যন্ত জরুরি।
এই প্রস্তাব মূলত পূর্ববর্তী পল্লী সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ কর্মসূচির সাফল্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। ১৯৮৩ সালে কেয়ার বাংলাদেশের মাধ্যমে কানাডিয়ান ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট এজেন্সির (সিডা) সহায়তায় সাতটি ইউনিয়নে একটি পাইলট প্রকল্প হিসেবে এই উদ্যোগ শুরু হয়েছিল। পরবর্তীকালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তায় এটি দেশব্যাপী সম্প্রসারিত হয় এবং পর্যায়ক্রমে ‘রুরাল এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড রোড মেইনটেন্যান্স প্রোগ্রাম’ (আরইআরএমপি-১, আরইআরএমপি-২ এবং আরইআরএমপি-৩) হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে এলজিইডি এর সর্বশেষ পর্যায়টি বাস্তবায়ন করেছিল।
পূর্ববর্তী কর্মসূচিগুলোর সাফল্যের ওপর ভিত্তি করে স্থানীয় সরকার বিভাগ গ্রামীণ যোগাযোগ রক্ষা, কৃষিজাত ও অ-কৃষিজাত পণ্যের বাজারজাতকরণ সহজতর করা, নারীর কর্মসংস্থানের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন এবং গ্রামীণ এলাকার সার্বিক জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে এই নতুন প্রকল্পটির প্রস্তাব করেছে।
প্রকল্পের আওতায় এলজিইডি দেশের আটটি বিভাগের অধীন ৬৪টি জেলার ৪৯৫টি উপজেলায় ৯১ হাজার ৫৬০ কিলোমিটার গ্রামীণ সড়কের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ কাজ পরিচালনা করবে।
জলবায়ু ঝুঁকি সূচক (সিভিআই), দারিদ্র্য সূচক এবং পরিবেশগত বিপর্যয় সূচকের মতো নির্দেশকগুলোর ওপর ভিত্তি করে প্রকল্পের এলাকাগুলো নির্বাচন করা হয়েছে। এতে গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং নারীর কর্মসংস্থানের মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী সম্প্রসারণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশন জানায়, প্রকল্পটি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার, বিশেষ করে দারিদ্র্য বিমোচন, কৃষি উন্নয়ন, দেশব্যাপী কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে ‘লাস্ট-মাইল’ বা প্রান্তিক যোগাযোগ নিশ্চিতকরণের প্রতিশ্রুতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এছাড়া প্রকল্পটি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি), বিশেষ করে এসডিজি-১ (দারিদ্র্য বিমোচন), এসডিজি-২ (ক্ষুধার অবসান ও টেকসই কৃষির প্রসার) এবং এসডিজি-৯ (শিল্প, উদ্ভাবন ও অবকাঠামো)-এর সাথে সংগতিপূর্ণ।
‘আইডিয়াল ডিজাইন অ্যান্ড কনসালটেন্সি’ কর্তৃক পরিচালিত একটি সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে এবং এর প্রাপ্ত ফলাফলসমূহ উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
প্রকল্পটির সেবাধর্মী প্রকৃতির কারণে কোনো আর্থিক ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ (কস্ট-বেনেফিট অ্যানালাইসিস) করা না হলেও পরিকল্পনা কমিশন উল্লেখ করেছে, পূর্ববর্তী আরইআরএমপি প্রকল্পগুলোর চমৎকার সাফল্য নির্দেশ করে যে প্রস্তাবিত এই কর্মসূচিটি থেকে উল্লেখযোগ্য আর্থ-সামাজিক সুবিধা পাওয়া যাবে।
প্রস্তাবিত বার্ষিক ব্যয়ের মধ্যে রয়েছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৫২২.৮৯ কোটি টাকা, ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ৫১৯.৩১ কোটি টাকা, ২০২৮-২৯ অর্থবছরে ৫১৮.৬৫ কোটি টাকা এবং ২০২৯-৩০ অর্থবছরে ৫২০.৭৫ কোটি টাকা। এছাড়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে একটি নামমাত্র বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি) ২০২৬ সালের ১ মার্চ অনুষ্ঠিত তাদের সভায় বাস্তবায়ন সময়সূচি সংশোধন, ক্রয় ও পরিচালন ব্যয় যৌক্তিকীকরণ, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা নিশ্চিতকরণ, প্রকল্প-পরবর্তী রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একটি এক্সিট প্ল্যান প্রণয়ন এবং চলমান অন্যান্য উন্নয়ন কর্মসূচির সাথে দ্বৈততা পরিহার করার শর্তে প্রকল্পটি অনুমোদনের সুপারিশ করে।
পরিকল্পনা কমিশন জানিয়েছে, প্রকল্পটি বছরজুড়ে গ্রামীণ সড়কের যোগাযোগ নিশ্চিত, কৃষিজাত ও অ-কৃষিজাত পণ্য পরিবহন ও বাজারজাতকরণ সহজতর, ৪৫ হাজার ৭৮০ জন সুবিধাবঞ্চিত নারীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে এবং গ্রামীণ বাংলাদেশের দারিদ্র্য বিমোচন ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে ২,০৮২.১২ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে ২০২৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বাস্তবায়নের জন্য প্রকল্পটি একনেক সভায় অনুমোদনের সুপারিশ করেছে কমিশন।







